(880)-2-9111260

Blog

নওগাঁর “প্রাণ ও প্রকৃতি”

জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতি, পরিবেশ রক্ষা ও মানব সেবার মহান ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “প্রাণ ও প্রকৃতির”। প্রকৃতি না বাঁচলে মানুষ বাঁচবেনা। মানুষের নানাবিধ পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ডে প্রকৃতি বিরুপ হচ্ছে, অপ্রয়োজনে হত্যা করা হচ্ছে পাখি সহ উপকারী বন্যপ্রাণী, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য যার ফলে নষ্ট হচ্ছে প্রকৃতির সাভাবিক ইকো সিষ্টেম। এর সরাসরি প্রভাব পরছে পরিবেশের উপরে যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীতে সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার অনিশ্চিত যাত্রা। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের বেশিরভাগ মানুষ এখনও জানেনা বন্যপ্রাণী হত্যা করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারনে অপ্রয়োজনে হত্যা করে বন্যপ্রাণী।

জীববৈচিত্র্য প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষায় ২০১০ ইং সনে এলাকার কিছু যুবক গ্রহণ করে নদীর বাঁধ ও রাস্তার পাশে বনায়ন কর্মসূচী। গাছগুলো একটু বড় হলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা এসে বাসা বাঁধে সেখানে। তখন তারা গাছে গাছে ঝুলিয়ে দেয় মাঠির কলস। শুরু হয় প্রাণ ও প্রকৃতির যাত্রা।

“গৃষ্মকালে পাখিদের প্রজনন কাল অনেক পাখি কলসে অশ্রয় নিয়ে বাচ্চা তোলে। প্রথমে মানুষ অনেক ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেছে পাগল বলেছে, একসময় গাছগুলো বড় হয়ে সম্পদ পরিণত হলো এবং আমাদের প্রকৃতি সংরক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হতে লাগলো তখন মানুষের মাঝে ইতিবাচক সারা পরে যায়, আমাদের পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়।”- বলেছেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কাজী নাজমুল।

জীববৈচিত্র্য পরিবেশে রক্ষা কাজটা অনেক চালেন্জিং ও ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক প্রতিকুলতা মোকাবেলা করে কাজ করতে হয় এই সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকদের । প্রতিনিয়ত ইয়ারগান দিয়ে ফাঁদ পেতে হত্যা করা পাখি খুনিদের ধরতে অনেক ঝুকি নিতে হয় তাদের।
“আমাদের জেলার কয়েকটি উপজেলায় পাখি শিকারীকে ইয়ারগান সহ ধরে পুলিশে খবর দিই এভাবে অসংখ্য পাখি শিকারিকে ইয়ারগান সহ ধরে পুলিশে দিয়েছি, শিকারের ফাঁত, জাল, বিষটোপ ইত্যাদি আটক করি।“- বলছিলেন সংগঠনের আরেক সদস্য।

শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ অভয়াশ্রম তৈরী করতে জেলায় কয়েকটি উপজেলার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া আত্রাই নদী সহ বিভিন্ন বিলে কচুরিপানা, বাঁশকাঠা, গাছের ডালপালা নিজেদের অর্থ ক্রয় করে নিরাপদ করে প্রাণ ও প্রকৃতি গড়ে তুলে পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম। তাদের আপ্রাণ চেষ্টায় নওগাঁ জেলায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য পাখি কলোনী।

বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে ছোট বড় মোট পাখি কলোনী ৪৭টি এর মধ্যে নওগাঁ জেলায় রয়েছে ১৩ টি এবং দেশের সর্ব বৃহৎ পাখি কলোনী আছে এই জেলার মহাদেবপুর উপজেলায় যা বনবিভাগ সহ বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভাবে নজরে এসেছে। বর্তমানে বন্যপ্রানী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণে নওগাঁ জেলা বাংলাদেশের মডেল । একাজে আরো বেশি উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে প্রাণ ও প্রকৃতির চারজন সদস্য বনায়ন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কানজারভেশন জাতীয় পদক পেয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোন জেলায় নেই।

পাখি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতিনিয়ত প্রচারণা চলতে থাকে মাইকিং ও হাট বাজার জনবহুল এলাকায় লিফলেট বিতরণ। বিভিন্ন স্কুল কলেজে সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন, পাখি কলোনী সমূহ এলাকায় পাখি মেলার আয়োজন সহ নানবিধ কার্যক্রম যা মাঝেমধ্যে পত্র পত্রিকা ও দেশের প্রায় সব টিভি চ্যানেলে প্রচার হয়ে থাকে । এসব থেকে মানুষ সচেতন হচ্ছে, গন মাধ্যমে প্রচারণার ফলে মানুষ জানতে পারছে, এবং বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে বিনোদন প্রিয় মানুষ আসছে পাখি প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে।

এছাড়াও প্রতি বছর তালবীজ রোপন সহ দেশীয় বৃক্ষ বট, ডুমুর, পাইকোর রোপনের ব্যাপক কার্যক্রম রয়েছে সংগঠনটির। প্রাণ ও প্রকৃতি দারিদ্র্য বিমচনে ও জলবায়ু পরিবর্তনে বিরুপ প্রভাব মোকাবেলায়ও কাজ করছে। ২০১০ ইং সন থেকে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও দারিদ্র্য বিমচনে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা এখনও তারা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে বনায়নের সদস্য ১৫৩ জন। ভূমির মালিক সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সরক জনপথ, বিভিন্ন দপ্তরের সাথে অংশীদার ভিত্তিতে কয়েক প্রজাতির বনজ, ফলজ, ও ঔষধি গাছ লাগিয়েছি সংগঠনটি। বনজ গাছগুলি যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হবে তখন গাছ বিক্রির ৪০ ভাগ টাকা পাবে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, ভূমির মালিক, এবং ৬০ ভাগ অর্থ পাবে প্রাণ ও প্রকৃতি। সংগঠনটির ইচ্ছা তারা এই অর্থ দরিদ্র বিমোচনের কাজে ব্যবহার করবে।

প্রতিষ্ঠাতা কাজী নাজমুল বলেছেন “আমাদের বনায়নে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ মানুষই দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর। বেকার যুবকদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আমরা নওগাঁ জেলাই সর্ব প্রথম নদীতে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ শুরু করি যা এখন এই জেলায় ব্যাপক ভাবে সম্প্রসারণ হচ্ছে এবং অনেক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১৮ তে জেলা পর্যায়ে সফল মাছ চাষের আমরা পুরুষ্কার পেয়েছি।

এভাবে চলে যাচ্ছে প্রাণ ও প্রকৃতির কার্যক্রম। জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি তাদের কাজের দায়িত্ব অনেকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দেশের জন্য আরো বেশি কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে ।