(880)-2-9111260

Blog

তেতুলিয়া পাঠশালা

একদল আত্ম-প্রত্যয়ী, তরুণ্যের শক্তিতে বলীয়ান তরুণেরা ২০১৬ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে চারদিকে নদীবেষ্ঠিত জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন দুর্গম দ্বীপ দূর্গাপাশায় নিরক্ষর শিশুদের অক্ষরজ্ঞান প্রদানের নিমিত্তে তেতুলিয়া পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করা হয়। বরিশাল জেলার অন্তর্গত বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৫নং দূর্গাপাশা ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া নদীর ওপাড়ে চারিদিকে নদীবেষ্টিত দ্বীপ চরদূর্গাপাশায় পাঠশালাটি অবস্থিত।

২০১৬ সালের ০৭ ডিসেম্বর একদল তরুণ পিকনিকের জন্য তেঁতলিয়া নদীর ওপাড়ে জেগ উঠা নদীর চর চরদূর্গাপাশায় যায়। দুইটি নদী পাড়ি দিয়ে ট্রলারে করে দূর্গাপাশার জনপদ থেকে যেতে চরদূগাপাশায় প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘন্টা সময় লাগে। নেই কোন হাট-বাজার। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে প্রতিনিয়ত ঐসব জনগোষ্ঠীকে ঝড়-বাদলের দিনেও দিতে হয় দুইটি নদী পাড়ি। কৌতুহলবশত তারা সেখানের জনগোষ্ঠী পেশা, শিক্ষা, যোগাযোগ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চায়। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জেনে তরুণেরা হতবাক হয়ে যায়।

চরদূর্গাপাশার ঐ জনপদের কেউ শিক্ষিত নয়। কেউই নিজের নাম পর্যন্ত লিখতে জানে না। অক্ষর জ্ঞানের অভাবে তারা যাবতীয় কার্যাবলীতে তাদের আঙ্গুলের টিপসই ব্যবহার করে। নদীতে মাছ ধরা অার চরে কৃষিকাজ করাই তাদের জীবনের গন্তব্য। ৬ থেকে ১০ বছরের শিশু-কিশোর যাদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা; অথচ এই বয়সে তাদের পরস্পররা হয়ে দারিয়েছে বাবা বা ভািইয়ের সাথে লাঙল হাতে মাঠে কৃষিকাজ করা ও জাল নিয়ে নদীতে মাছ ধরা। এসব বিষয় ঐ তরুণদরে খবই মর্মাহত করে। তারা ভাবতে শুরু করে কিভাবে ঐ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই ঐসব উদ্যমী তরুণেরা সবার জন্য শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে চারদিকে নদীবেষ্ঠিত চরদূর্গাপাশায় শিক্ষার আলো নিয়ে আসে। সুবিধাবন্চিত নিরক্ষর এসব শিশুদের তথা জনবিচ্ছিন্ন দূর্গম নদীচরের জনগোষ্ঠীকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে আলোকিত মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে গড়ে তোলা হয় তেঁতুলিয়া পাঠশালা।

তেতুলিয়া পাঠশালা একটি স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণমুলক মানব হিতৈষী সংগঠন। সংগঠনটি সহযোগীতামুলক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবী কর্ম উদ্দ্যোগের দ্বারা সর্ব জনসাধারনের জন্য আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্য ক্রম পরিচালনা করে। তেতুলিয়া পাঠশালার লক্ষ্য ক্ষুধা-দারিদ্র-নিরক্ষরতা-মাদক-বাল্যবিবাহমুক্ত, গঠনমূলক সংস্কৃতিতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত সমাজ গড়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে অংশীদার হওয়া।

তেতুলিয়া পাঠশালার উদ্দেশ্যগুলো হলো:
১. সুবিধাবঞ্চিত নারী-শিশু তথা জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা সহায়তা প্রদান
২. বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকরণ ও যৌতুক প্রথা নিবারণ
৩. মাদক বিরোধী আন্দোলন জোরদারকরণ ও মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাকরণ
৪. মুক্তিযুদ্ধের চতনায় গঠনমূলক সাংস্কৃতিক বিকাশ সাধন
৫. কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নে সার্বিক সহায়তা প্রদান
৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাকরণ
৭. পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন ও বৃক্ষরোপন
৮. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিগত সার্বিক সহায়তা প্রদান
৯. প্রতিবন্ধির বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে সার্বিক সহায়তা প্রদান
১০. স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ
১১. আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণ

বর্তমানে তেতুঁলিয়া পাঠশালায় ৫০ জনের মতো শিক্ষাথী রয়েছে। তেতুঁলিয়া পাঠশালা শিক্ষা কার্যক্রমে পাশাপাশি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ সভা, বৃক্ষরোপন, মাদক বিরোধী সভা, পাশাপাশি আইটি শিক্ষা নিয়ে কাজ করে ।

তেতুঁলিয়া পাঠশালা ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ১ম শ্রেণীতে ১২ জন শিক্ষাথী ভর্তি হয়। বর্তমানে ২য় শ্রেণীতে ও ৩য় শ্রেণীতে ৩৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদেরকে আমরা বিভিন্ন শিক্ষা উপকরনের পাশাপাশি শীতের পোশাক সহায়তা করেছি। জানুয়ারির ১৩ তারিখে চরের ববাসরত সকলকে নিয়ে বাল্য বিবাহ ও উন্নত চাষাবাদ শীর্ষক কর্মশালা হয়। বিগত ২৫ বছরের মধ্যে এর এই প্রথমবারের মতো ৩য় শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছে। তেতুঁলিয়া পাঠশালা দুই নদীর মাঝখানে অবস্থানের কারনে উন্নত শিক্ষা কার্যক্রমে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাই তেতুঁলিয়া পাঠশালা এখানে অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার মাধ্যমে প্রযুক্তি সহায়তায় উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চরের বসবারত কৃষকদের দিয়ে কিভাবে প্রযুক্তি সহয়তায় উন্নত চাষাবাদ করা যায় সে বিষয়ে তারা কাজ করবে।